প্রকৃতির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে রহস্য রোমাঞ্চ এবং তার সাথে সংখ্যা। সংখ্যা না থাকলে জগতের সকল প্রতিসাম্যতা ভেঙে পড়তো। স্নোফ্লেক দেখতে সুন্দর কারণ তা ৬০ ডিগ্রি কোণে ঘোরালে একই থাকে।
![]() |
স্নোফ্লেক |
সংখ্যার মাহাত্ম এতটাই যে গ্রীক গণিতবিদেরা ১.৬১৮০৩৩৯৮৯..... এই সংখ্যাটির পূজা করত। সংখ্যাটি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ফিরে এতবার এসেছে যে শুধুমাত্র এ সংখ্যাটি নিয়ে লেখা হয়ে গেছে বড় বড় আর্টিকেল আর অজস্র বই। মোনালিসা চিত্রকর্মটি দেখতে কেন এত সুন্দর কারন তার দৈর্ঘ্য - প্রস্থের অনুপাত ১.৬১৮০৩৩৯৮৯.....। সকল সৌন্দর্যের পেছনের মূল কারিগর কিন্তু এই সংখ্যাটি।
ইংরেজ কবি, পার্শি বেশি শেলী বলেছেন," Beauty is truth and truth is beauty." আর গণিতে কোন মনগড়া গল্পের স্থান নেই তা সত্যতাকে স্বীকার করে নেয় এ কারণে তা এত মনোমুগ্ধকর। মিশরীয় সভ্যতার শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রকৃতির যেকোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গণিত সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী ফিবোনাচ্চি খরগোশের বংশধারা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফিবোনাচ্চি ধারার জন্ম দেন। ধারাটি এরকম: ০,১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১........। পরবর্তী পদ সব সময় পূর্ববর্তী দুটি পদের সমষ্টি। এছাড়াও এই ধারাটি মৌমাছির বংশ বৃদ্ধিতে এবং আনারসের পাতার বৃদ্ধিতেও পাওয়া গিয়েছে।
নিউটন তার খামারবাড়িতে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে একদিন একটি সরল প্রশ্ন করলেন। আপেল পৃথিবীতে পড়ে কিন্তু চাঁদ আকাশ থেকে পড়ে না কেন? সরল এ প্রশ্নটি ক্যালকুলাস নামক বিস্ময়কর পরিঘটনার জন্ম দেয়। তারপর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যার জন্য এটি কত বড় হাতিয়ার। বক্র পথের দৈর্ঘ্য কিংবা বক্র আকৃতির কোন কিছুর আয়তন বা ক্ষেত্রফল আপনি সহজেই পরিমাপ করতে পারবেন ক্যালকুলাস ব্যবহার করে।
নিউটন যেদিন মারা গেল তখন তার অধরা স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সেদিনই জন্ম হলো এক শিশুর। তার নাম জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।
তিনি বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বল কে একীভূত করার জন্য ক্যালকুলাসের পথ প্রশস্ত করেন। জন্ম দেন ভেক্টর ক্যালকুলাসের। তারপর তিনি নিউটন ও আইনস্টাইনের পর সবচেয়ে সেলিব্রেটি বিজ্ঞানী বনে গেলেন।
আইনস্টাইন তার ছেলেবেলায় "পপুলার বুকস ফর ন্যাচারাল সায়েন্স" বইটি পড়েছিলেন। বইয়ে একটি তারের খুঁটির পাশে দৌড় কল্পনা করতে বলা হয়েছিল।
আইনস্টাইন তখন চিন্তা করলেন আলোর গতিবেগে দৌড়ালে কি হবে। পরে সমস্যাটি নিয়ে তিনি দশ বছর ভাবেন। এরপর তিনি তার বন্ধু মাইকেল গ্রসম্যান এর শরণাপন্ন হন। তিনি আইনস্টাইনকে কার্ল ফ্রেডরিক গাউস ও তার ছাত্র বার্নার্ড রিম্যান এর নব প্রতিষ্ঠিত স্থান কালের বক্রতার জ্যামিতি এবং টেন্সর অ্যানালাইসিস এর সন্ধান দেন। এটি ব্যবহার করেই আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বৃহত্তম তত্ত্ব "সাধারণ আপেক্ষিকতা" ১৯১৫ সালে "প্রুশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সে" প্রকাশ করেন। ওই গবেষণাপত্র গুলোই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মাস্টারপিস।
আপনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ছাড়া এক পাও এগোতে পারবেন না। এখানে দক্ষ হতে হলে আপনাকে জানতে হবে গণিতের সম্ভাবনার তত্ত্ব।
নিউটন পদার্থবিজ্ঞানকে কোন নতুন বিষয় বলে আখ্যায়িত করতে নারাজ ছিলেন । তিনি এটিকে গণিতের একটি শাখা বলে মনে করতেন। কারণ এখানে গণিতের প্রাচুর্য বর্তমান।
যদি একটু রসায়নের দিকে নজর দেন এখানেও দেখবেন গণিত রাজত্ব করেই চলেছে। কারণ কোন পদার্থের প্রতি মোলের মধ্যে ৬.০২৩*১০^২৩ টি পরমাণু অনু বা আয়ন থাকে। এটি যে কোনো পদার্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি কোন একটি ম্যাজিকাল নাম্বার যা প্রকৃতির মধ্যে গুপ্ত অবস্থায় রয়েছিল । এটি প্রথম আমাদের সামনে আনেন ইতালিয়ান রসায়নবিদ এভোগেড্রো ।
ম্যাজিকে আচ্ছন্ন এই পৃথিবীকে মুক্তি দিতে ইউরোপে যে রেনেসাঁ ঘটেছিল তা ছিল গণিত নির্ভর।
আপনি প্রকৃতির যত গভীরে ঢুকবেন প্রকৃতি তত সরল হবে এবং অংকের ঐকতানে যেভাবে প্রকৃতি কম্পিত হচ্ছে তা আপনাকে দেখিয়ে দেবে। এও বলে দেবে যে গণিত তার পরম বন্ধু তাকে ছাড়া গোটা মহাবিশ্বের সকল প্রতিসাম্যতা ভেঙে পড়বে।
শাহরিয়ার আহমেদ
সৈয়দপুর সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, সৈয়দপুর, নীলফামারী , বাংলাদেশ।

.jpeg)