Visit our YouTube channel Visit Now Watch Now!

মহাকর্ষ বল পার্ট-১

মহাকর্ষ বল
Shahriar Ahmed

 


প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের ও পৃথিবীর সাথে যে আকর্ষণ এটি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের যেন শেষ ছিল না। তারা বিশ্বাস করত অদৃশ্য কোন একটা শক্তি পৃথিবীর সাথে আমাদের ধরে রেখেছে। 


আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে গ্রিক সভ্যতায় অ্যারিস্টটলিয়ান দর্শনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোন প্রচলন ছিল না।সেখানে যুক্তি তর্কের মাধ্যমে যা প্রমাণ হতো তাই মানুষ বিশ্বাস করত। 

সেখানে মানুষ বিশ্বাস করত একটি ভারী বস্তুকে পৃথিবী বেশি আকর্ষণ করে আর একটি হালকা বস্তুকে পৃথিবী কম আকর্ষণ করে এ কারণে ভারি বস্তুটি আগে মাটিতে পড়বে কিন্তু এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোন প্রয়োজন বোধ মানুষ সেকালে করেনি। 


পরবর্তী এক হাজার বছর এ ধারণার খুব একটা বিকাশ ঘটেনি। মুসলিম সভ্যতায় হাসান ইবনে আল হাইসাম (আল সাজেন) নামক একজন পদার্থবিজ্ঞানী বলেছিলেন কোন একটা বল আমাদের সাথে পৃথিবী কে ধরে রেখেছে। ভারতীয় সভ্যতায় পণ্ডিত ভাস্কর বলেছিলেন যে পৃথিবীর সাথে আমাদের একটা অদৃশ্য টান রয়েছে। কিন্তু এটির শুধুমাত্র শিরোনামটি পাওয়া গিয়েছে তবে তার ব্যাখ্যার পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। 


ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে এই ধারণার বিকাশ লাভ করতে থাকে। ততদিনে সৌরকেন্দ্রিক মডেল শক্ত ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। 

কেপলার এ সময় সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের উপর তিনটি সূত্র প্রদান করেন। 


গ্যালিলিও ইতালির পিসা টাওয়ার থেকে ভিন্ন ভরের দুটি ভারী বস্তু মাটিতে ফেলেন যারা বাতাসের বাধা কে উপেক্ষা করতে পারে। তিনি দেখেন যে দুইটি বস্তু একই সময় মাটিতে পড়েছে। তবে ঘটনাটি খুব মুখরোচক হলেও তা যথেষ্ট সন্দেহজনক। 


ইতালির পিসা টাওয়ার যাকে কেন্দ্র করে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন কাহিনী


কিন্তু গ্যালিলিও একটি কাজ করেছিলেন। তিনি সমতল একটি ঢালু পৃষ্ঠের ওপর দুটি ভিন্ন ভরের বস্তু গড়িয়ে দেন। দেখেন যে তারা একই সময়ে ভূমিতে পৌঁছিয়েছে। খুব ছোট স্কেলে করা এ কাজটি বেশ সাফল্য এনে দিয়েছিল। 


এরপর গ্যালিলিও বিনা বাধায় পড়ন্ত বস্তুর উপর তিনটি সূত্র প্রদান করেন। ঠিক যেদিন গ্যালিলিও মারা গেলেন সেদিনই তার অধরা স্বপ্নগুলোকে পূরণ করার জন্য এক বিস্ময় বালকের জন্ম হলো। 


তার নাম স্যার আইজ্যাক নিউটন। তিনি ম্যাজিক আর যাদু বিদ্যায় আচ্ছন্ন জগতকে আমূল বদলে ফেললেন। 

(তাঁর তো আপেল পড়ার সেই অতিরঞ্জিত কাহিনী আমরা সহস্রবার শুনেছি। কিন্তু এর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিউটন নিজেই বলেছেন যে মহাকর্ষের ধারণাটি আমার মাথায় এমন ভাবে এলো যেন আমি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আপেল গাছের নিচে বসে ছিলাম। আর একটা আপেল আমার মাথায় এসে পড়ল। কিন্তু একটা শুধুমাত্র আপেল পড়ার ঘটনা থেকে মহাকর্ষের এত এত সূত্র আবিষ্কার হয়ে যাবে এটা বিশ্বাস করাটা কঠিন।) 


তিনি মহাকর্ষ বলের বিখ্যাত সূত্রটি প্রদান করেন। তাঁর সমীকরণে একটি ধ্রুবক ছিল। যাকে বলা হয় সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। একে G দ্বারা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু G এর মান এতই কম যে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের ৭০ বছর পর এটি পরিমাপ করেছিলেন হেনরি ক্যাভেন্ডিস নামক এক ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী। 


(তিনি মহাকর্ষ বল পরিমাপের জন্য খুবই কার্যকরী একটি সুতা ব্যবহার করেছিলেন যাকে বলা হয় টরসন ফাইবার)। কারণ মহাকর্ষ বল এতই দুর্বল যে নিউটনের সময় এটিকে পরিমাপ করার প্রয়োজনীয়তা মানুষ অনুভব করেনি। 


নিউটন নিজেকে একদিন একটি প্রশ্ন করেছিলেন। আপেল পৃথিবীতে পরে কিন্তু চাঁদ পৃথিবীতে পড়ে না কেন। তখন নিউটন বুঝলেন যে সকল গণিতে নিয়ে আমরা কাজ করি তা দিয়ে একে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এভাবেই তিনি গণিতের উচ্চতর শাখা ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন।


( গ্যালিলিওর সময়ে মানুষ মনে করত একজন দেবতা পৃথিবীকে সব সময় পেছন দিক থেকে ঠেলা দিচ্ছে। এ কারণে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। যদি দেবতাকে বাদ দেন দেখবেন যে এ ধারণা দিব্যি এখনো টিকে আছে!) এরপর বিভিন্ন ধারণার উদয় হতে থাকে কিন্তু কোনটি সফলতার মুখ দেখেনি।

 

১৭৫০ সালে একটি ধারণার জন্ম হয়েছিল। এ ধারণাটির মূল কথা ছিল এই যে, চারিদিক থেকে বিভিন্ন ধরনের কণা পৃথিবীতে ধাক্কা দিচ্ছে কিন্তু এক পাশে সূর্য থাকায় সে কণাগুলো সূর্যের বাধা প্রাপ্ত ফিরে যাচ্ছে। তাই পৃথিবীতে ধাক্কা দিতে পারছে না। 


কিন্তু পৃথিবীর বিপরীত পাশ থেকে আসা কণাগুলো পৃথিবীতে ধাক্কা দিচ্ছে এ কারণে সেটি সব সময় সূর্যের দিকে সরে যাচ্ছে এবং সূর্যের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বল অনুভব করছে। ধারণাটি মনে হচ্ছে বহু বছর ধরে চলে আসা একটি জিগস পাজলের সমাধান দিয়ে দিয়েছে তাই না? কিন্তু এ ধারণাটির আসলে ভুল কোথায়? 


ধারণার ভুল হল পৃথিবীর সামনে থেকে আসা কণাগুলো পৃথিবীতে যত জোরে ধাক্কা দিবে পেছন থেকে আসা কণা গুলো ধাক্কা দিবে তার চেয়ে কম।এর ফলে পৃথিবী কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার কথা। সুতরাং বাস্তব অর্থেই বোঝা যাচ্ছে যে ধারণাটি ভুল। 


ঠিক মাত্র আজ থেকে ১০০ বছর আগেও মানুষ বিভিন্ন ধরনের আজগুবি ধারণা পোষণ করত। 

আমার এখনো বিংশ শতাব্দীর সেরা ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। তিনি একটি মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন যে, "পৃথিবী এবং সূর্যের মাঝে একটি বল কাজ করছে তাই এটি সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। এ সময় একজন মহিলা দর্শকের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালো এবং বলল, "পৃথিবী একটি কচ্ছপের পিঠের উপর স্থাপিত রয়েছে আর কচ্ছপটি সূর্যের চারদিকে একটি বৃত্তাকার পথে ঘুরছে। এখানে কোন বল ক্রিয়া করছে না। আপনি যা বলছেন তা মিথ্যে।" তখন বার্ট্রান্ড রাসেল উল্টো প্রশ্ন করলেন যে,"কচ্ছপটি কার উপর রয়েছে?" মহিলা বললেন," ভদ্রলোক আপনি বেশ বুদ্ধিমান। কচ্ছপটির নিচেও একটি কচ্ছপ রয়েছে আর এভাবে নিচ পর্যন্ত কচ্ছপের অসীমভাবে সিঁড়ি তৈরি হয়ে গিয়েছে।" 


আর এ সকল ধারণাকে পদতলে পিষ্ট করে আধুনিক মহাকর্ষ বলের থিওরি প্রদান করেন আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে। যেটি তিনি প্রকাশ করেন "প্রুশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সে"। এর গল্প থাকবে ২য় পার্টে।

 

শাহরিয়ার আহমেদ
সৈয়দপুর সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, সৈয়দপুর, নীলফামারী



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Information is wealth... MKR Web
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.