আইনস্টাইন যখন ১৯১৫ সালে মহাকর্ষ বল কে "আপেক্ষিকতা তত্ত্ব" -এর সাথে একিভূত করলেন তখনও কোয়ান্টাম মেকানিক্সে খুব একটা উন্নতি সাধিত হয়নি। কিন্তু পরবর্তী ২০ বছরে "কোয়ান্টাম মেকানিক্স"-এ এলো বৈপ্লবিক গতি (কোয়ান্টাম মেকানিক্স হলো এমন একটি তত্ত্ব যেখানে খুবই ক্ষুদ্র কণা নিয়ে কাজ করা হয়। যেমন- প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন, নিউট্রিনো, ফোটন ইত্যাদি)।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর সাফল্য স্বচক্ষে দেখার পর উদ্যমী হয়ে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ বলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রয়োগ করতে চাইলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের প্রতিবারই
আশাহত হতে হল। যখনই মহাকর্ষ বলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রয়োগ করা হলো তখন যেসব ফলাফল আসলো সেখানে অসীমের বন্যা বয়ে গেল।
রিচার্ড ফাইনম্যান কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকসে (QED) ও উদ্যমী ডাচ বিজ্ঞানী জেরার্ড টি হুফট "ইয়ং-মিলস" থিওরিতে, অসীমগুলো দূর করার জন্য যেসব কষ্টকর প্রচেষ্টা রপ্ত করেছিলেন তার প্রত্যেকটি মহাকর্ষ বলকে কোয়ান্টাইজড করতে ব্যর্থ হল।
আলো যেমন ফোটন নামক কণাসমূহের গুচ্ছাকারে চলে তেমনি মহাকর্ষ বল "গ্রাভিটন"(Graviton) নামক কণিকাদের গুচ্ছাকারে ক্রিয়া করে। সবকিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছিল কিন্তু "গ্রাভিটন" যখন পরমাণু কিংবা অন্যান্য "গ্রাভিটনের" সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন এর ফলাফল অসীম আসে।
বিজ্ঞানীরা নাছোড়বান্দার মতো হন্যে হয়ে এমন একটা তত্ত্ব খুঁজছিলেন যেগুলো এই অসীম গুলোকে দূর করতে পারে। সত্তর এর দশকে এমন একটা তত্ত্বের আবির্ভাব হলো যেটি বিজ্ঞানীদের ইন্দ্রিয়ানুভূতির সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুললো। এ তত্ত্বের নাম "স্ট্রিং থিওরি"।
এই তত্ত্বের শুরুটা করেছিলেন ১৯৬৮ সালে দুজন বিজ্ঞানী যাদের নাম হচ্ছে মাহিকো সুজুকি এবং গ্যাব্রিয়েল ভেনেজিয়ানো ।
বিজ্ঞানীরা এ তত্ত্বের মধ্যে আশার আলো দেখতে পেলেন কারণ এটি একমাত্র তত্ত্ব যা "গ্রাভিটনের" অসীম ফলাফল কে দূর করতে পারত যা এর পূর্বে কোন তত্ত্বই দাবি করতে পারেনি। এই তত্ত্বের সব আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু আসলে একে ঘিরেই।
এ তত্ত্বে বলা হয় যে মহাবিশ্বের সকল মৌলিক কণাগুলো সুতা কিংবা স্ট্রিং এর মত এক প্রকার বস্তুর ক্ষুদ্র কম্পনে সৃষ্টি হয়। গ্রাভিটন কণা স্ট্রিং এর সবচেয়ে ক্ষুদ্র কম্পনেই উৎপন্ন হয়। সুতরাং এই তত্ত্বে মহাকর্ষ বল কে কখনোই উপেক্ষা করা যায় না।
পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটন একবার বলেছিলেন, "স্ট্রিং থিওরি জোর করে আমাদের উপর মহাকর্ষ বল চাপিয়ে দেয়।"
কিন্তু বহুল আলোচিত প্রশ্নটি হল যদি গ্রাভিটন কণা থেকেই থাকে তাহলে আমরা কি একে কখনো ডিটেক্টরে ধরতে পারবো?
উত্তরটি হচ্ছে সম্ভবত না। কিন্তু একে যদি আমরা কখনো ধরতেও পারি তাহলে আমাদের খুবই কঠিন পরীক্ষাগুলো সম্মুখীন হতে হবে।
কারণ এর কোনো ভর নেই, কোন চার্জ নেই, এর স্পিন ২ এবং এটি একটি বোসন শ্রেণীর কণা অর্থাৎ এটি ফার্মিয়ন শ্রেণীর কণা যেমন- প্রোটন, নিউট্রন কিংবা ইলেকট্রনের সাথে কোনো মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয় না ( যেসব কণাগুলোর ভয় রয়েছে সেগুলো ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা এবং যেসব কণাগুলোর ভর নেই সেগুলো বোসন শ্রেণীর কণা)।
যদি গ্রাভিটন কণার কোন অস্তিত্ব থাকে তাহলে আপনি যে আর্টিকেল পড়ছেন এই মুহূর্তে আপনার মধ্য দিয়ে এই-কণার স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছে। আর এই কণা যদি ফার্মিয়ন শ্রেণীর কণাদের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হতো তাহলে আমাদের দেহের নিউক্লিয়াস ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত। তাছাড়া গবেষণাগারে কেউ উৎপন্ন করতে গেলে লাগবে প্রচুর শক্তি যার যোগান দেওয়া খুবই কষ্টসাধ্য।
স্ট্রিং থিওরিতে আমাদের মহাবিশ্বের মাত্রা ১০ কিংবা ১১ টি। খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে মহাকর্ষ বল কোন ক্রিয়া করে না। কিন্তু আমরা যখন গ্রহ নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সিদের দিকে তাকাই তখন এই বলকে আমরা ক্রিয়া করতে দেখতে পাই। হতে পারে যে এই বল শুধুমাত্র উচ্চমাত্রায় ক্রিয়া করে।
যদি এই বল উচ্চমাত্রায় ক্রিয়া করে তাহলে আমরা গ্রাভিটনকে শুধুমাত্র উচ্চ মাত্রায় ক্রিয়া করতে দেখতে পারবো। তাই তিন মাত্রায় ( দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা এদের প্রত্যেকটি এক একটি মাত্রা বলা হয়। কিন্তু স্ট্রিং তাত্ত্বিকরা ধারণা করেন এর বাইরেও অনেক মাত্রা রয়েছে কিন্তু আমরা তা দেখতে পারিনা) বসবাসকারী জীব হিসেবে আমরা দুঃখজনকভাবে এই কণা ধরতে পারবো না।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা তারপরও আশা ছাড়তে রাজি নন। তারা আরো উন্নত এবং বিভিন্ন প্রকার তত্ত্বের জন্ম দিয়ে মহাকর্ষ বলকে কোয়ান্টাম থিওরির আওতায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্ট্রিং থিওরির পর মহাকর্ষ বল কে ব্যাখ্যা করার জন্য জন্ম হওয়া কিছু তত্ত্ব- এর নাম নিচে দেওয়া হল:
Supergravity (১৯৭৬ সাল)
Loop Quantum Gravity (১৯৮৮ সাল)
Tensor-vector-scalar Gravity (২০০৪ সাল)
Presurron Theory (২০১৩ সাল)
Cornformal theory
মহাকর্ষ বলকে ব্যাখ্যা করার জন্য এখন পর্যন্ত আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

