সূচনা:
১৯০০ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক যখন আলোর ফোটন কণার ক্ষেত্রে তাঁর "কোয়ান্টাম তত্ত্ব" দেন তখন থেকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের যাত্রা শুরু হয়। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন তাত্ত্বিকভাবে পরমাণুর প্রমাণ দেন।
১৯১১ সালে রাদারফোর্ড নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করেন। ১৯১৩ সালে নীলস বোর পরমাণু মডেল প্রকাশ করেন। এরপরের বছরগুলোতে বিজ্ঞানীদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হলো না।
১৯২০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই কোয়ান্টাম তত্ত্বে এলো বৈপ্লবিক গতি। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির মতো সে সময় এত অদ্ভুত নীতির জন্ম হতে থাকলো যে সেগুলো আমাদের চেনাজানা জগতের সাথে খাপে খাপে মিল ছিল না।
তাই সে সময় থেকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে অনেক সন্দেহ, চরম উত্তেজনা আর কোল্ড ওয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। যাকে বলা হয় ঠান্ডা যুদ্ধ (উল্লেখ্য এটি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কোল্ড ওয়ারের কোন কিছু না)।
কিন্তু যত উদ্ভটই হোক না কেন, থট এক্সপেরিমেন্ট এবং যান্ত্রিকভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে এ সকল ঘটনা সত্য। তাই বর্তমানে এগুলো শক্ত আসনে খুঁটি গেড়ে বসে গিয়েছে।
কোয়ান্টাম তত্ত্ব এতই শক্তিশালী যে এর ভবিষ্যদ্বাণী দশমিকের ১১ ঘর পর্যন্ত পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে এটি সত্য। কিন্তু সে সময় হট টপিক্স ছিল যেন এগুলোকে ঘিরেই।
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্ক:
![]() |
১৯৩০ সালে সলভে কনফারেন্সে তোলা ছবি |
এতসব বিতর্কের মাঝেই বেশ কয়েকটি সলভে কনফারেন্সের আয়োজন করা হয় কিন্তু এসব বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছায় বেলজিয়ামের ব্রাসেলস-এ অনুষ্ঠিত "ষষ্ঠ সলভে কনফারেন্সে" ১৯৩০ সালে।
এই সলভে কনফারেন্সে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুই মতের দুইটি দল সৃষ্টি হয়। এক দলে ছিল কোয়ান্টাম এর বিদ্রোহীরা আরেক দলে ছিলেন কোয়ান্টামের বিরোধিতাকারীরা।
কোয়ান্টামের বিদ্রোহীদের মধ্যে ছিলেন নীলস বোর ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ আর কোয়ান্টামের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে ছিলেন আইনস্টাইন এবং শ্রোডিঙ্গার।
কিন্তু এই দুই জনই এক সময় কোয়ান্টাম-বিপ্লব শুরু করতে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু এটি ছিল ভাগ্যের পরিহাস। যুগে যুগে এরকম বিজ্ঞানীদের বিতর্কে লিপ্ত হতে দেখা গিয়েছে।
আইনস্টাইন বারবার এই কনফারেন্সে কোয়ান্টাম এর বিরুদ্ধে কথা তুলেছেন, কিন্তু নীলস বোর সফলভাবে রুখে দিয়েছেন।
আইনস্টাইন নীলস বোরকে বললেন,"ঈশ্বর মহাবিশ্ব নিয়ে পাশা খেলেন না।" তখন বোর পাল্টা প্রত্যুত্তর দিলেন,"ঈশ্বরকে উপদেশ দেওয়া বন্ধ করুন।"
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ জন হুইলার বলেছেন," আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিবৃত্তি ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় বিতর্ক।গত ৩০ বছরে মহান দুজন মানুষের মধ্যে এত দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের অদ্ভুত এই মহাবিশ্বকে উপলব্ধির জন্য গভীরতর পরিণতির সঙ্গে এত গভীর কোন বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে কখনো শুনিনি।"
তবে ইতিহাসবিদেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একমত যে, সেবার নীলস বোর ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ বিতর্কে জয়ী হয়েছিলেন।
তবে আইনস্টাইন দেখাতে সক্ষম হন যে, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ধ্বসের কিনারায় টলমল করছে। কাদামাটির পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক দানব যে একটু ভূমিকম্প হলেই মাটিতে পড়ে যাবে।
তবে বর্তমানেও কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে আগ্রহ আর কৌতূহলের যেন শেষ নেই। সকল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু যেন একটি বিড়ালকে ঘিরেই। এটি হলো একটি থট এক্সপেরিমেন্ট যাকে বলা হয় "শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল"। এই বিড়াল মারা যাবে না বেঁচে আছে তা আমরা বর্তমানে কোন তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করতে পারি না। তবে আমাদের কাছে যেদিন একটি পদার্থবিজ্ঞানের সার্বিক তত্ত্ব আসবে সেদিন আমরা এর ব্যাখ্যা দিতে পারব।

