সূচনা:
বিজ্ঞানী বলতে আমরা সুপার হিউম্যানকেই চিনি যাঁরা ভুল করেন না, যাঁরা সর্বদা কল্পনার সাগরে ডুব মেরে থাকেন এবং যারা বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন যেভাবে দ্বীপ লোকালয় হতে বিচ্ছিন্ন। আসলে গণমাধ্যমে বিজ্ঞানীদের বিগ ব্যাক থিওরি সিরিজের মতো হতাশাবাদী অথবা ডক ব্রাউনের সিনেমার মতো অদক্ষ নার্ড হিসেবে দেখানো হয় ।
তবে বিজ্ঞানীরা নানান রুচিবোধের হতে পারেন। যেমন-রিচার্ড ফাইনম্যান বেশ হাসিখুশি আর চটকদার স্বভাবের লোক ছিলেন । নিজের চকমবাজিতে অশ্লীল সব গল্প বলতে পারতেন।
বিজ্ঞানীরা আমাদের চাইতে বেশি স্মার্ট কারণ তারা একটি সমস্যা নিয়ে অনেকদিন লেগে থাকতে পারেন। হয়তো সেটা কয়েক বছর হতে পারে। যেমন-আলোর গতি বেগে দৌড়ালে কি হবে সেটা নিয়ে আইনস্টাইন ১০ বছর ভেবেছিলেন।
তাঁরা বেশ আত্মপ্রত্যয়ী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁদের হার না মেনে নেওয়া দৃষ্টিভঙ্গি তাদের বড় করেছে। আলবার্ট আইনস্টাইন সুপারস্টার হয়েও যে কখনো পদার্থবিজ্ঞানের কোনো ধারণা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে গিয়ে ভুল করেন নি সে নিশ্চয়তাও আপনাকে কেই বা দেবে । আসুন সে গল্পই আজকে জানা যাক।
ঘটনা ১. মহাজাগতিক ধ্রুবক জোর করে তাঁর সমীকরণে চাপিয়ে দেওয়াকে আইনস্টাইন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলেছেন (The greatest blunder)। বিশ্বাস আর বিজ্ঞানের বিরোধ দীর্ঘদিনের ।
আইনস্টাইন একটি স্থিতিশীল অর্থাৎ অসীম মহাবিশ্বে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্বই তাঁকে জানান দিচ্ছিল যে মহাবিশ্ব প্রসারণশীল। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে মাটি চাপা দিয়ে তিনি নিজের বিশ্বাসের কাছে হেরে যান । ১৯২৯ সালে হাবল প্রমাণ করে দেন যে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে।
হিটলার যখন জার্মানিতে ইহুদিদের কচুকাটা করছিলেন তখন আইনস্টাইন আমেরিকায় পাড়ি জমালেন এবং পারমাণবিক বোমা বানানোর দলের একজন প্রধান সদস্য ছিলেন। আমেরিকা সরকার তখন তাকে প্রিন্সটনে লুকিয়ে রেখেছিল একটি গোপন কুঠিরে। সেসময় তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের "ইনস্টিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডিজ" এ যোগ দেন।
সেখানে তার প্রতিবেশী ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ট গোডেল। তিনি দেখান যে একটা মহাবিশ্ব যদি স্থিতিশীল হয় তাহলে তাকে ঘূর্ণায়মান হতে হবে। আর এটি হলে কেউ যদি স্পেসশিপে চড়ে মহাবিশ্বের চারদিকে খুব জোরে ঘোরে তাহলে সে অতীতে চলে যাবে।
তাখন সে অতীত সংক্রান্ত খুব জটিল প্যারাডক্সের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠবে অর্থাৎ এটি পদার্থবিজ্ঞানের লঙ্ঘন। তারপর আইনস্টাইনের আর বুঝতে বাকি রইল না যে তাঁর সমীকরণে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক এর কোনো প্রয়োজন নেই।
পরবর্তীতে তাঁকে তাঁর হিসাব থেকে এই ধ্রুবককে বাদ দিতে হয়। কিন্তু ৮০ এর দশকে এই ধ্রুবক অতিপ্রয়োজনীয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে এবার মহাবিশ্বের প্রসারণকে রুখে দিতে নয়, তাকে ব্যাখ্যা করতে। এখনো ব্যাখ্যাতীত ডার্ক-এনার্জি সংক্রান্ত গবেষণায় এ ধ্রুবক দিবি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঘটনা ২. আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বকে অবিশ্বাস করতেন। তাঁর এই গোঁড়ামি তাকে উপহাসের পাত্র বানিয়েছিল ।
১৯৩০ সালে তিনি নীলস বোর ও কোয়ান্টামের বিদ্রোহীদের সাথে ইতিহাসসেরা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কে লিপ্ত হন। জন হুইলার বলেন," আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল।"
এ কোয়ান্টাম তত্ত্বের নীতিগুলো এতই উদ্ভট ছিল যে বাস্তব জগতে কোনো অভিজ্ঞতাই এখানে কাজে দিতনা; বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তো ।
এখনকার দিন হলে হলে আইনস্টাইন অবশ্যই তা বিশ্বাস করতেন । কারণ কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী দর্শমিকের পর ১১ ঘর পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্মলগ্নের সময় নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে ছিলেন ।
ঘটনা ৩. আইনস্টাইন মনে করতেন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কৃষ্ণগহ্বর গঠিত হতে পারেনা । ১৯৩৯ সালে নাথান রোজকে নিয়ে লেখা একটি পেপারে তাঁর এ সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
কিন্তু ঠিক সে বছরই রবার্ট ওপেনহেইমার ও তাঁর ছাত্র হার্টল্যান্ড সিন্ডার প্রমাণ করেন যে কৃষ্ণগহ্বর প্রাকৃতিকভাবে গঠিত হতে পারে । আসলে আইনস্টাইন বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
কিন্তু তাঁর সফলতার পাল্লাই বেশি । ফটো-তড়িৎ ক্রিয়া, ব্রাউনীয় মোশন, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, বোস-আইনস্টাইন তত্ত্ব ইত্যাদির ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য সারা বিশ্বে মানুষের মনে শক্ত আসন অধিকার করেছেন।
