এমপক্স কি?
এমপক্স একটি ভাইরাস জনিত প্রাণিবাহিত (Zoonotic) রোগ।
এ রোগকে কেন এমপক্স বলা হয় ?
১৯৫৮ সালে ডেনমার্ক-এ বানরের দেহে সর্বপ্রথম এ রোগ সনাক্ত হয় বলে একে এমপক্স বা মাঙ্কি পক্স বলা হয়।
১৪ই আগস্ট ২০২৪ এ এমপক্স কে নিয়ে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এ রোগটি কোথায় দেখা যায় ?
এ রোগটি প্রাদুর্ভাব প্রধানত মধ্য আফ্রিকা ও পশ্চিম আফিকায় দেখা যায়। ইতিপূর্বে অন্যান্য দেশেও এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। তবে সে ক্ষেত্রে আফিফ্রকান দেশসমূহে ভ্রমণের অথবা সেখান থেকে আমদানিকৃত প্রাণীর সংস্পর্শে আসার ইতিহাস রয়েছে।
এ রোগে কি কি উপসর্গ দেখা যায়?
সাধারণ উপসর্গ হলঃ
- জ্বর (৩৮° সে-এর বেশী)
- প্রচন্ড মাথা ব্যথা
- শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লসিকাগ্রন্থি ফুলে ও ব্যথা হওয়া (Lymphadenopathy)
- মাংসপেশীতে ব্যথা হওয়া
- আবসাদগ্রস্ত হওয়া
- ফুসকুড়ি - যা মুখ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে
- হাতের তালু পায়ের তালুসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরে (সাধারণত জ্বরের ৩ দিনের মধ্যে)।
উপসর্গ কতদিন স্থায়ী হয় ?
সাধারণত উপসর্গ শুরুর পর ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
উপসর্গ দেখা দিলে করণীয় কি?
সবার আগে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখতে হবে।
সাথে সাথে চিকিৎসক/নিকটস্থ স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্র/হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
সাথে সাথে আইইডিসিআর-এর হটলাইনে (১০৬৫৫) যোগাযোগ করতে হবে।
আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থতার কোন পর্যায়ে এ রোগ ছড়ায় ?
দৃশ্যমান ফুসকুড়ি (vesicle, pustule) থেকে শুরু করে ফুসকুড়ির খোসা (crust) পড়ে যাওয়া পর্যন্ত- আক্রান্ত ব্যাক্তি হতে রোগ ছড়াতে পারে।
এ রোগে কি কি জটিলতা হতে পারে?
প্রায় সকল ক্ষেত্রেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্ত ব্যাক্তি সুস্থ হয়ে যায়।
তবে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের (যেমন- অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিস, কিডনি রোগী, ক্যান্সারের রোগী,
এইডস-এর রোগী, নবজাতক শিশু, গর্ভবতী নারী) ক্ষেত্রে এটা শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।
শারীরিক জটিলতাগুলো হলো:
-ত্বকে সংক্রমণ
-নিউমোনিয়া
-মানসিক বিভ্রান্তি
-চোখে প্রদাহ, দৃষ্টি শক্তি লোপ পেতে পারে।
সুতরাং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিগন আক্রান্ত হবার সাথে সাথেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
কোন কোন প্রাণী থেকে এ রোগ ছড়ায় ?
-এমপক্সে আক্রান্ত বানর থেকে;
-ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, খরগোশ বর্গের পোষক (Reservoir)- এর মাধ্যমে।
তবে সাধারণত গৃহপালিত প্রাণী (যেমন– গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগী, মহিষ) থেকে এ রোগ ছড়ায় না।
এমপক্স ২ ভাবে ছড়ায় মানুষ থেকে এবং প্রানি থেকে :
১.মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ:
• সরাসরি সংস্পর্শ: আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের ঘা, র্যাশ বা ফোস্কা সহ শরীরের তরলের সরাসরি সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে মাংকিপক্স ছড়াতে পারে।
• শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে: দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাসের ড্রপলেটের মাধ্যমে সংক্রমণ হতে পারে, তবে এটি সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের প্রয়োজন।
• দেহের তরল বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ: আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের তরল বা ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে (যেমন চুম্বন, আলিঙ্গন বা যৌনসম্পর্ক) মাংকিপক্স ছড়াতে পারে।
২.প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমণ:
• সংক্রমিত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে: সংক্রমিত প্রাণী যেমন বানর বা অন্যান্য বন্যপ্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে এই রোগ ছড়াতে পারে।
• সংক্রমিত প্রাণীর মাংস বা রক্তের সংস্পর্শে আসলে: সংক্রমিত বন্যপ্রাণীর মাংস বা রক্তের সাথে সংস্পর্শে এলে মাংকিপক্স হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ঃ
পিসিআর (PCR) টেস্টের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়. MPVX নামে পরিচিত.
চিকিৎসাঃ
মাংকিপক্সের চিকিৎসা সাধারণত উপসর্গ নিরাময়ের লক্ষ্যে করা হয়, কারণ এটি একটি স্বল্পস্থায়ী এবং স্ব-সীমিত রোগ, যার অর্থ হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি নিজের থেকেই সেরে যায়। তবে, কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিষেধক এবং ওষুধ:
-টেকোভিরিম্যাট (Tecovirimat): তবে এটা কতটুকু কার্যকরী সে সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়নি। (সর্বশেষ আপডেটঃ জুন১৮,২০২৪)
-ব্রিনসিডোফোভির (Brincidofovir): তবে এটা কতটুকু কার্যকরী সে সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ( সর্বশেষ আপডেটঃ জুন১৮,২০২৪).
-Vaccinia Immune Globulin Intravenous (VIGIV): তবে এটা কতটুকু কার্যকরী সে সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়নি ।
এ রোগের কি টিকা আছে?
গুটিবসন্তের টিকা, এমপক্সের প্রতিষেধক হিসেবে অনেকাংশেই কার্যকর। তবে বিশ্বব্যাপী এ টিকা এখন সহজলভ্য নয়। উল্লেখ্য যে, যারা ইতোপূর্বে গুটিবসন্তের টিকা গ্রহণ করেছেন (১৯৮০ সালে সর্বশেষ গুটিবসন্তের টিকা দেয়া হয়), তারা এমপক্স সংক্রামণ থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত।
তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, স্মলপক্স বা জলবসন্তের জন্য ব্যবহৃত টিকা মাঙ্কিপক্স প্রতিরোধে ৮৫ শতাংশ কার্যকর।
বিশ্বের কোন কোন দেশে এই রোগ এখন পর্যন্ত সনাক্ত হয়েছে ?
সর্বশেষ তথ্যমতে ১০১টি দেশে এ রোগের নতুন প্রাদুর্ভাবের তথ্য পাওয়া গেছে (২৯-০৮-২০২২ পর্যন্ত)। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সাল থেকে এ বছরের (২০২২) এপ্রিল পর্যন্ত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার ১১টি দেশে এমপক্সের পুরোনো প্রাদুর্ভাব রয়েছে।
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে অথবা আক্রান্ত দেশ থেকে ফের আসার ২১ দিনের মধ্যে জ্বর আসলে এবং ফুস্কুড়ি দেখা দিলে আপনার দেহে এমপক্স ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা থাকতে পারে।
সে ক্ষেত্রে আপনি অতিসত্বর আইইডিসিআর-এর হটলাইনে (১০৬৫৫) যোগাযোগ করুন ।
এমপক্স সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্তকতা :
■ নিয়মিত মাস্ক ও চশমা ব্যবহার করতে হবে।
■ অপরিচ্ছন্ন হাতে মাস্ক, ত্বক ও চোখ স্পর্শ থেকে বিরত থাকুন।
■ নিয়মিত সাবান, পানি অথবা স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
■ আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন
■ এমপক্স রোগীকে বাড়িতে আইসোলেশনে রাখতে হবে
■ যেখানে সেখানে থুথু, কফ ফেলা থেকে বিরত থাকুন।
■ রোগী সুস্থ হলেও অন্তত ৩ মাস শারীরিক দূরত্বে থাকুন।
■ ঘরে তৈরি খাবার খান, বাইরের খাবার পরিহার করুন।
■ লক্ষণ দেখা দিলে ১৬২৬৩/১০৬৫৫ নম্বরে যোগাযোগ করুন


